তেল, সাবান, রঙ ফর্সা করা ক্রিম আর মোবাইলের অ্যাডের মডেল তিশা-নিরব-মোনালিসা-ইমন ছাড়াও আরেক জাতের মডেল আছে। এরা হচ্ছে ssc আর hsc পরীক্ষার্থী। বোর্ড পরীক্ষার তিন-চার মাস আগে মডেল টেস্ট দেয়া এখন খুব কমন একটা বিষয়। এককালে আমি দিয়েছি, এখন আমাদের ছোট ভাই-বোনেরা দেয়।
আমার প্রথম মডেল টেস্ট দেয়া দেলোয়ার স্যারের কাছে। ক্লাস টেনে সায়েন্সের বিষয়গুলো স্যারের কাছেই পড়া এবং সেই সূত্রে মডেল দেয়া। পরীক্ষা ভাল দিলাম কিন্তু খাতা দেবার সময় দেখি সব ছাত্রের লজ্জায় মাথা হেট হবার মত অবস্থা।
খাতার কোন পৃষ্ঠা স্যার কেটেকুটে বাদ রাখেননি। সব প্রশ্নের উত্তর কিংবা অংকে তিনি কোন না কোন ভুল ধরেছেন। নাম্বারের অবস্থা আরো খারাপ। যারা এ প্লাসের স্বপ্নে বিভোর তাদের পাশ ফেল নিয়ে টানাটানি।
বেশী চেনা মুখ ছাত্রদের খাতা দেবার সময় স্যার সেইরকম ঝাড়ি দিলেন। আমি সাধারণ মানের ছাত্র হওয়ায় বেঁচে গেলাম। তবে এই খাতা বাসাতে দেখাই কেমনে? স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় যেখানে অংকে পেয়েছি পুরো একশ, সেটা নেমে এসেছে সত্তরের ঘরে। বাকীগুলো মনে নেই, তবে তা পাশ মার্কের আশেপাশেই ছিল। ভীষন হতাশ হয়ে গেলাম, এদিকে আসল পরীক্ষার মাত্র সপ্তাহখানেক বাকী। স্যারের অনেক পজিটিভ দিক ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় ছাত্ররা কিছু পারে না এটা প্রমান করে তিনি বেশ তৃপ্তি পেতেন। টিউশনি করাতে গিয়ে আমিও স্যারের সেই বিশেষ গুণ আয়ত্ত করেছি।
এইচ এস সি পরীক্ষার মাস তিনেক আগে আবার মডেল হওয়ার প্রবল উত্তেজনা। রসায়নের রস আস্বাদন কত প্রকার ও কী কী তার পুরোটা জানতে পারি গুহ স্যারের বাসায়। মডেল টেস্ট দেবার জন্য আমাদের সবার নামে একেকটা মোটা খাতা ছিল। নিয়ম হচ্ছে সব পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত খাতা স্যারের বাসায় রক্ষিত থাকবে। মহা উৎসাহে পরীক্ষা শুরু হল। বেশ কিছুদিন পর আবিষ্কৃত হল, আমারসহ চার-পাঁচ জনের খাতা নেই। স্যার লজ্জিত ভাবে বললেন, “তোমরা ভাল লিখছ দেখে মনে হয় কেউ নিয়ে গেছে, পরে ঠিক দিয়ে দেবে।”

আমরা বুঝলাম ঘটনা আসলে অন্যখানে। আমাদের NDC গ্রুপের সাথে VNC এর একটা গ্রুপের ক্যাঁচাল লেগেই থাকে। ওরাই আমাদের শিক্ষা দিতে খাতা সরিয়েছে। কিন্তু প্রমান ছাড়া তো অ্যাকশনে যাওয়া যায় না। স্যার আমাদেরকে সুন্দর দেখে নতুন খাতা দিলেন। পরের সপ্তাহে আবার সেই খাতা গায়েব। এবার সদা হাসিখুশী স্যার ও খেপে গেলেন। আমরা সরাসরি মেয়েদের দায়ী করলাম। লেগে গেল ঝামেলা। পরে কিভাবে যেন এবারের খাতা উদ্ধার হল। কিন্তু এরপর থেকে আমাদের কয়জনার খাতা স্যার আর জমা রাখতেন না।
ফিজিক্সের জন্য নাম লেখাতে যাই এলাহী স্যারের কাছে। আমাকে দেখে বললেন, “পড়াশোনার খবর নাই, এখন আমরা সবাই মডেল হব!!!” আসলে ফিজিক্স সোজা লাগত বলে স্যারের কাছে টানা পড়তাম না। ফার্স্ট ইয়ার- সেকেন্ড ইয়ার দুবারেই কয়েক মাস পড়ার পর নোটপত্র নিয়ে ভাগতাম। এজন্য আমার উপর স্যারের রাগ ছিল। স্যারের এখানে কড়া নিয়ম ছিল ছেলেরা পরীক্ষা দেবে বিকেলে আর মেয়েরা সকালে, কোন মুখ দেখাদেখি নেই। কিন্তু এক ছেলে নাম লেখাতে আসল তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে, তারা একসাথে পরীক্ষা দেবে। স্যার চোখ গরম করে বললেন, “সারাবছর ঘুরে বেড়াও আবার মডেল হতে আসছ একসাথে? দূর হও।”
এত মডেল টেস্ট দিতে দিতে আর ভাল্লাগে না। রচনামূলক প্রশ্ন লিখতে সবসময় আমার অনীহা। দুষ্ট বুদ্ধি আসল মাথায়, বেশীরভাগ গানিতিক প্রশ্নাবলী উওর দিতে শুরু করলাম অথবাসহ। অল্প পরিশ্রমে সর্ব্বোচ্চ মার্কস পেতে থাকি কারন এলাহী স্যার প্রশ্ন মিলিয়ে খাতা দেখতেন না। সঠিক হলেই নাম্বার দিতেন। কিন্তু একদিন গিয়ে দেখি স্যার অগ্নিশর্মা। বললেন, “যা ইচ্ছা তাই করবা নাকি? তোমার আর পরীক্ষা দেয়া লাগবে না।” খাতা নিয়ে দেখি পেয়েছি ৫০ এর মধ্যে ৫৫। এজন্যে ধরা খেয়েছি। আরে আমি কি আর জানতাম সবগুলো অংক রাইট হয়ে যাবে!! “স্যরি স্যার, আর হবে না।” বলে কোনরকমে পার পেলাম। এরপর থেকে আমি সোজা হয়ে গেলাম, আর স্যার নিজেও কড়াভাবে আমার খাতা দেখতে থাকলেন এবং নাম্বার নেমে আসল ত্রিশের ঘরে।

মডেল টেস্ট দেয়ার ভাল-মন্দ দুটোই আছে। তবে বেশি জায়গায় দৌড়াদৌড়ি না করাই ভাল। আমার অনেক ফ্রেন্ডদের দেখতাম বোর্ড-পরীক্ষক, মূলবই এর লেখক এদের কাছে সাজেশনের আশায় আট-দশ হাজার টাকা খরচ করে টেস্ট দিচ্ছে। এতে অযথা বাবা-মার টাকা খরচ করা ছাড়া কাজের কাজ আসলে কিছুই হয় না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন