স্মৃতিকথন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃতিকথন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

একটি জবা গাছ আর আমরা ক'জনা

বাড়ির পিছনের আধেক ক্ষয়ে যাওয়া পুকুর ঘাটে একলা বসে আছি। সেই শান-বাধাঁনো পুকুর ঘাট আজ আর নেই। পুকুরের পানিও সেই আগের মত টলটলা নেই, কেমন যেন একটা সবুজাভ আস্তরন। চারপাশটা বড় বেশী শান্ত আর নিঝুম – অদ্ভুত রকমের মন খারাপ করা। অসহ্য এই নিরবতা দূর করতে একটা একটা করে বরই জলের মাঝে ছুড়ে মারতে থাকি, হাত দুটো খালি হলে মনটাও ফাঁকা ফাঁকা লাগে।




এই পুকুরের ধারেই একটা জবাফুলের গাছ ছিল। গাছ না বলে ওটাকে আমাদের বাড়িও বলা যেতে পারে। জবাগাছ আকারে বেশী বড় না হলেও এটা বেশ বড় ছিল, আর সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা হল এর একেকটা শাখা আমাদের মত একেকজন ছোট ছোট মানুষকে অনায়াসে ধারন করতে পারত। আজ সেই গাছটি নেই আর তার বাসিন্দারাও শেষ কবে একসাথে হয়েছে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। দাদুর মুখে যখন প্রথম শুনি গাছটা কেটে ফেলা হয়েছে তখন মনে হয়েছিল আমার ঘর যেন কেউ ভেঙ্গে দিয়েছে।

সবচেয়ে উঁচু শাখায় বসত সামী। আমার বছর তিনেকের বড় হলেও বাবার মৃত্যু তাকে অনেক বদলে দিয়েছে। এখন সে বিরাট এক পীর। রুবা ও বেশ উঁচুতেই থাকত, কলেজের ইংরেজি টীচার হতে যার খুব বেশী দেরী নেই। সাহজাদী আর যায়েদ দু ভাইবোন থাকতো মাঝের শাখা গুলোয়। সাহজাদী এখন ইটালীতে থাকে স্বামীর সাথে, দুটা ফুলের মতন বাচ্চা হয়েছে ওর। বছর দুয়েকের বড় হলেও ওকে “তুমি” করে ডাকতাম, বিয়ের পর “আপনি” তো বটেই রীতিমত আপু ডাকা শুরু করি – দুলাভাইয়ের সুনজরে থাকতে হবে না !!! চেষ্টা বৃথা যায়নি, আমার প্রথম গিফট পাওয়া মোবাইলখানা দুলাভাইয়ের দেয়া। যায়েদ টাও অনেক দূরে সরে গেছে। আমি ফোন দিলে ধরেনা, কারন জানে সবসময় আমি তাকে রাজনীতির ছাইপাশ ছেড়ে চলে আসতে বলব।

ক্লাস ওয়ান আর টুতে পড়া মেরী আর আমি ঝুলতাম নিচের ডালগুলোয়। ছোট হওয়ায় উপরে চান্স পেতাম কম। আর আমাদের রুম ও নির্ধারিত ছিল, কাজেই আগে উঠলেও অন্যের ডালে বসতাম না। মেরী আমার আট মাসের ছোট। তারপরেও গত বছর যখন ওর বিয়ে হয় আমি মনে মনে তাকে আপু ডাকার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি। কিন্তু আমাকে পুরো অবাক করে দিয়ে সে বড় গলায় আমাকে “ভাইয়া” ডাকা শুরু করে দেয়  !!! আমার এই বোনটাও আজ বহুদূরে স্বামীর সাথে মিশরে আছে।

জবা গাছ নেই, তার মানুষগুলো ও নেই। আমি একলা একলা পুকুর পাড়ে হাটি বিষন্ন মনে, নিজেও দাদাবাড়ি এসেছি পাঁচ বছর পর। একটু পর পুচ্চি জেনারেশন আমাকে ঘিরে ধরে আর তাদের দলনেতা নাইনে পড়ুয়া বোনটা আমার হাতে জলপাই ভর্তা তুলে দেয়। আমি কেমন যেন ওদের সাথে সহজ হতে পারিনা, নিজেকে বেমানান লাগে। আমার খেলার সাথীরা সব কই ??

আমার মডেল হওয়া


তেল, সাবান, রঙ ফর্সা করা ক্রিম আর মোবাইলের অ্যাডের মডেল তিশা-নিরব-মোনালিসা-ইমন ছাড়াও আরেক জাতের মডেল আছে। এরা হচ্ছে ssc আর hsc পরীক্ষার্থী। বোর্ড পরীক্ষার তিন-চার মাস আগে মডেল টেস্ট দেয়া এখন খুব কমন একটা বিষয়। এককালে আমি দিয়েছি, এখন আমাদের ছোট ভাই-বোনেরা দেয়।

আমার প্রথম মডেল টেস্ট দেয়া দেলোয়ার স্যারের কাছে। ক্লাস টেনে সায়েন্সের বিষয়গুলো স্যারের কাছেই পড়া এবং সেই সূত্রে মডেল দেয়া। পরীক্ষা ভাল দিলাম কিন্তু খাতা দেবার সময় দেখি সব ছাত্রের লজ্জায় মাথা হেট হবার মত অবস্থা।

খাতার কোন পৃষ্ঠা স্যার কেটেকুটে বাদ রাখেননি। সব প্রশ্নের উত্তর কিংবা অংকে তিনি কোন না কোন ভুল ধরেছেন। নাম্বারের অবস্থা আরো খারাপ। যারা এ প্লাসের স্বপ্নে বিভোর তাদের পাশ ফেল নিয়ে টানাটানি।

বেশী চেনা মুখ ছাত্রদের খাতা দেবার সময় স্যার সেইরকম ঝাড়ি দিলেন। আমি সাধারণ মানের ছাত্র হওয়ায় বেঁচে গেলাম। তবে এই খাতা বাসাতে দেখাই কেমনে? স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় যেখানে অংকে পেয়েছি পুরো একশ, সেটা নেমে এসেছে সত্তরের ঘরে। বাকীগুলো মনে নেই, তবে তা পাশ মার্কের আশেপাশেই ছিল। ভীষন হতাশ হয়ে গেলাম, এদিকে আসল পরীক্ষার মাত্র সপ্তাহখানেক বাকী। স্যারের অনেক পজিটিভ দিক ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় ছাত্ররা কিছু পারে না এটা প্রমান করে তিনি বেশ তৃপ্তি পেতেন। টিউশনি করাতে গিয়ে আমিও স্যারের সেই বিশেষ গুণ আয়ত্ত করেছি।

এইচ এস সি পরীক্ষার মাস তিনেক আগে আবার মডেল হওয়ার প্রবল উত্তেজনা। রসায়নের রস আস্বাদন কত প্রকার ও কী কী তার পুরোটা জানতে পারি গুহ স্যারের বাসায়। মডেল টেস্ট দেবার জন্য আমাদের সবার নামে একেকটা মোটা খাতা ছিল। নিয়ম হচ্ছে সব পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত খাতা স্যারের বাসায় রক্ষিত থাকবে। মহা উৎসাহে পরীক্ষা শুরু হল। বেশ কিছুদিন পর আবিষ্কৃত হল, আমারসহ চার-পাঁচ জনের খাতা নেই। স্যার লজ্জিত ভাবে বললেন, “তোমরা ভাল লিখছ দেখে মনে হয় কেউ নিয়ে গেছে, পরে ঠিক দিয়ে দেবে।”


আমরা বুঝলাম ঘটনা আসলে অন্যখানে। আমাদের NDC গ্রুপের সাথে VNC এর একটা গ্রুপের ক্যাঁচাল লেগেই থাকে। ওরাই আমাদের শিক্ষা দিতে খাতা সরিয়েছে। কিন্তু প্রমান ছাড়া তো অ্যাকশনে যাওয়া যায় না। স্যার আমাদেরকে সুন্দর দেখে নতুন খাতা দিলেন। পরের সপ্তাহে আবার সেই খাতা গায়েব। এবার সদা হাসিখুশী স্যার ও খেপে গেলেন। আমরা সরাসরি মেয়েদের দায়ী করলাম। লেগে গেল ঝামেলা। পরে কিভাবে যেন এবারের খাতা উদ্ধার হল। কিন্তু এরপর থেকে আমাদের কয়জনার খাতা স্যার আর জমা রাখতেন না।

ফিজিক্সের জন্য নাম লেখাতে যাই এলাহী স্যারের কাছে। আমাকে দেখে বললেন, “পড়াশোনার খবর নাই, এখন আমরা সবাই মডেল হব!!!” আসলে ফিজিক্স সোজা লাগত বলে স্যারের কাছে টানা পড়তাম না। ফার্স্ট ইয়ার- সেকেন্ড ইয়ার দুবারেই কয়েক মাস পড়ার পর নোটপত্র নিয়ে ভাগতাম। এজন্য আমার উপর স্যারের রাগ ছিল। স্যারের এখানে কড়া নিয়ম ছিল ছেলেরা পরীক্ষা দেবে বিকেলে আর মেয়েরা সকালে, কোন মুখ দেখাদেখি নেই। কিন্তু এক ছেলে নাম লেখাতে আসল তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে, তারা একসাথে পরীক্ষা দেবে। স্যার চোখ গরম করে বললেন, “সারাবছর ঘুরে বেড়াও আবার মডেল হতে আসছ একসাথে? দূর হও।”

এত মডেল টেস্ট দিতে দিতে আর ভাল্লাগে না। রচনামূলক প্রশ্ন লিখতে সবসময় আমার অনীহা। দুষ্ট বুদ্ধি আসল মাথায়, বেশীরভাগ গানিতিক প্রশ্নাবলী উওর দিতে শুরু করলাম অথবাসহ। অল্প পরিশ্রমে সর্ব্বোচ্চ মার্কস পেতে থাকি কারন এলাহী স্যার প্রশ্ন মিলিয়ে খাতা দেখতেন না। সঠিক হলেই নাম্বার দিতেন। কিন্তু একদিন গিয়ে দেখি স্যার অগ্নিশর্মা। বললেন, “যা ইচ্ছা তাই করবা নাকি? তোমার আর পরীক্ষা দেয়া লাগবে না।” খাতা নিয়ে দেখি পেয়েছি ৫০ এর মধ্যে ৫৫। এজন্যে ধরা খেয়েছি। আরে আমি কি আর জানতাম সবগুলো অংক রাইট হয়ে যাবে!! “স্যরি স্যার, আর হবে না।” বলে কোনরকমে পার পেলাম। এরপর থেকে আমি সোজা হয়ে গেলাম, আর স্যার নিজেও কড়াভাবে আমার খাতা দেখতে থাকলেন এবং নাম্বার নেমে আসল ত্রিশের ঘরে।


মডেল টেস্ট দেয়ার ভাল-মন্দ দুটোই আছে। তবে বেশি জায়গায় দৌড়াদৌড়ি না করাই ভাল। আমার অনেক ফ্রেন্ডদের দেখতাম বোর্ড-পরীক্ষক, মূলবই এর লেখক এদের কাছে সাজেশনের আশায় আট-দশ হাজার টাকা খরচ করে টেস্ট দিচ্ছে। এতে অযথা বাবা-মার টাকা খরচ করা ছাড়া কাজের কাজ আসলে কিছুই হয় না।

আমার ডেঙ্গুকাহিনী

তখন আমার এস এস সি টেস্ট পরীক্ষার মাস খানেক বাকী। দেশে সেবার ই প্রথম এডিস মশার সুনাম ছড়িয়েছে। এদিকে আমার তখন ব্যাপক পড়াশুনা, যতক্ষন বাসায় থাকি টেবিলেই বসে থাকি। কি যে পড়ি আল্লাই ভাল জানে, তবে মাকে তো খুশী রাখতে হবে।

আমাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে বাবা একটা মশক নিধন যন্ত্র কিনে আনলেন, দেখতে অনেকটা র‌্যাকেট এর মত, ব্যাটারীতে চলে। এর সংস্পর্শে মশা আসা মাত্রই ঠাস ঠাস পটকা ফুটতে থাকে আর মশা বাবাজী পুড়ে খালাস। আমি তো এটা কে পেয়ে যারপরনাই খুশী, পড়াশুনার পাশাপাশি বিনোদনের ব্যবস্থা। আমার টেবিলের চারপাশে হলে তো কথাই নেই, পুরো রুমের আনাচে কানাচে মশা দেখলেই যন্ত্র নিয়ে চড়াও হই। এহেন আনন্দ বেশী দিন টিকল না, মা-জননী বুঝতে পারলেন যে আমার বিনোদন বেশী হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং দ্বিতীয় সিস্টেম আসল বাসায়।


আমার জন্য একটা টেবিল মশারীর ব্যবস্থা হলো যেটা আমার টেবিল চেয়ার সমেত আমাকে বন্দী করে ফেলল। এটা যে কী জিনিস ভাই না দেখলে বোঝানো যাবে না! বাসায় যেই আসত আমাকে মশারীর ভেতর খুব আগ্রহের সাথে দেখত আর খুব ই মজা পেত। মুখে বলত যে না খুব ভাল হইসে, নিশ্চিন্তে ছেলেটা পড়াশুনা করতে পারতেসে, ডেঙ্গুর ভয় নাই। প্রিয় র‌্যাকেট হারিয়ে মর্মাহত ভাবে বন্দী দশায় আমার দিন কাটতে থাকে।

একদিন সকালে কোচিং থেকে বাসায় ফেরার পর আমার কাপায়া জ্বর আসল। সবার ধারনা হল বাইরে থেকে কামড় খায়া আসছি, বাসায় তো মশাদের চান্স ই নাই। তিন দিন নরমাল জ্বরের মতই ভুগলাম। চতুর্থ দিন জ্বর না আসায় সবাই নিশ্চিন্ত হল যে না ডেঙ্গু হয় নাই। আমিও ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়ন, মানে টেবিল মশারীর ভেতর ফেরত যাই।

সন্ধ্যের দিকে মনে হল বুকে কেমন যেন পাথর জমে আছে, নিশ্বাস নিতে পারছি না। আবার জ্বর উঠতে লাগল, হাত-পা কেমন যেন লালচে মনে হচ্ছে, আসলে র্যািশ উঠতেসে- তখন বুঝি নাই। রাতে রক্ত বমি হল, চাপ চাপ বেশ অনেক খানি রক্ত আসল। মাকে বলি, মা আমি মনে হয় আর বাচঁবো না।

সেই রাত দশ টার দিকে ডি এম সি ইমার্জেন্সীতে নেয়া হল আমাকে। এটা কোন ধরনের ইমার্জেন্সী আ্মার জানা নাই, দশ টাকার টোকেন দিয়ে আমাকে ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিল। ইমার্জেন্সী থেকে ওয়ার্ড এত সুদীর্ঘ করিডর আমার জীবনে দেখি নাই, হাটতে হাটতে জান শেষ। প্লেটলেট কাউন্ট আসল এক লাখ বিশ হাজার। ডেঙ্গুর কোন পর্যায়ে আছি বুঝলাম না, কারন দেশে তখন ডেঙ্গুর মাত্র ফার্স্ট সিজন চলছে।

ওয়ার্ডের ডাক্তার আমাদেরকে তাজ্জব করে দিয়ে বলে ডেঙ্গু হয় নাই। সে উলটো এন্টিবায়োটিক দিয়ে আমাকে রাত একটার সময় বাসায় পাঠিয়ে দেয় আর প্রবলেম হলে আবার আসতে বলে। অথচ ডেঙ্গু রোগীদের এন্টিবায়োটিক নিষিদ্ধ!!! খুশী মনে বাসায় ফিরি, যাক ডেঙ্গু হয় নাই। আমার নিজেরো একটা কনফিডেন্স ছিল- আমি থাকি সারাদিন মশারীর ভিতর, আমার আছে অত্যাধুনিক মশক নিধন র‌্যাকেট, ডেঙ্গু আমার হতে যাবে কোন দুঃখে??

পরদিন সকালে জ্বর মাপতে গিয়ে দেখি একশই আছে। কিন্তু দিনের আলোয় ভয়ানক যে জিনিস টা আবিষ্কার হল, আমার সারা শরীরে ছোট ছোট লাল গুটির মত র‌্যাশ উঠসে আর চোখের কোঠায় রক্ত জমসে। কেউ কেউ দেখে বলল, মনে হয় হাম হইসে। এই ১৬ বছর বয়সে হাম! ব্যাপারটা আমার জন্য লজ্জাজনক। হাম তো সেই পিচ্চিকালে একবার হইসে, জীবনে এটা একবারই হয় জানতাম।

সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে বাবা তখনি আমাকে নিয়ে ডিএমসি ছুটল। আবার সেই একই প্রসেস। প্রথমে ইমার্জেন্সী তারপর লম্বা করিডর ধরে ওয়ার্ড নাম্বার ১, পুরাই পেইন। ছোটখাট সুন্দরমত এক ডাক্তার আমার সবকিছু দেখে বলে, ওর তো ডেঙ্গু হইসে, এখনি ভর্তি করান। রাতের ঘটনা তাকে খুলে বললে বিরক্ত হয়ে বলল, ওই ডাক্তারকে গিয়ে খুঁজে বের করেন।

আমি পুরোপুরি হতাশ। এখানে থাকতে হবে আমাকে, চারদিকে কেওয়াজ- নানান কিসিমের মানুষজন। এটা নাকি ডেঙ্গু ইউনিট। আমার ধারনা হল ডেঙ্গু যদি আমার নাও হয়ে থাকে এখানে থাকলে নির্ঘাত হবে, কোন রক্ষা নেই। বাবাকে বললাম কেবিন নিতে, কিন্তু কয়েকজন আংকেলকে ফোন করেও কেবিন পাওয়া গেল না। প্রাইভেট হসপিটাল গুলোতে যোগাযোগ করা হল কিন্তু তারা ডেঙ্গু রোগী রাখতে রাজী না!! অগত্যা ওখানেই একটা বেডে গাঁটছড়া বাধলাম, যে হারে রোগী আসতেসে পরে এটাও পাওয়া যাবে না। সত্যি সত্যিই কিছুক্ষন পর দেখি একটা বেডও ফাকা নাই, মানুষজন বারান্দায় আস্তানা গাড়তেসে।

আবার টেস্ট করা হল, এবারে প্লেটলেট কাউন্ট আশি হাজার। আমি ভয়ে আধমরা, এভাবে মাইনাস হতে থাকলে তো আমি আর নাই। একটা স্যালাইন দিয়ে আমাকে আপাতত সাইজ করা হল। আমার দেখাশোনার দায়িত্ব নিলেন দু একজন নার্স (নারী-পুরুষ উভয়ই), এখানে আসার আগে আমার ধারনা ছিল নার্স মাত্রই মহিলা।

কিছুক্ষন পর অল্পবয়স্ক কিছু ডাক্তারের ভীড় লক্ষ করা গেল ওয়ার্ডে। এদের মধ্যে একটা গ্রুপ আমাকে ঘিরে জটলা পাকালো। তারা নানান প্রশ্নবানে আমাকে জর্জরিত করল। স্টেথোস্কোপ, প্রেশার মাপার যন্ত্র ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মনোযোগ সহকারে খাতায় টুকলিফাই করল। এতগুলো ডাক্তার আমাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ভেবে আমি খুশী হলাম, কারন এদের মধ্যে কয়েকজন ডাক্তার আপুও ছিল। ওই বয়স থেকে আজ অবধি সাদা এপ্রন পরা সেবাপরায়না আপুদের দেখলে কেন যেন আমার মন ভাল হয়ে যায়।

একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এদের সবাইকে ডেকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে লেকচার দিতে শুরু করলে আমার ভুল ভাঙ্গে। আরে এরা তো মেডিকেলের পোলাপান। আমাকে নিয়ে এতক্ষন প্রাক্টিকাল ক্লাস করসে!!! এদের এতসব প্রশ্নের উত্তর দিলে আমার রোগমুক্তি হবেনা, এখান থেকে ছাড়াও পাওয়া যাবে না। নাহ, আর এদেরকে চান্স দিব না।

বিকেলের দিকে আমার দর্শনার্থী আসা শুরু হল। মামা-চাচা, নানা-নানী থেকে শুরু করে ঢাকায় থাকে এমন প্রায় সব আত্মীয়-স্বজন আসলেন। এমনকি আমার কোচিং এর ম্যানেজার ও এলেন। তাকে বাবা দায়ী করলেন যে ওখান থেকেই আমি আক্রান্ত হইসি। তিনি আমতা আমতা করে আমার পড়াশুনার গুনগান করে প্রস্থান করলেন। আমার বেডের আশপাশে নানাবিধ ফল-ফ্রুটের আনাগোনা লক্ষ করা গেল। যতদূর মনে পরে মেডিকেলের বিখ্যাত খানা আমি খাই নাই। আমার জন্য চাইনিজ স্যুপ আনা হইছিল। কিন্তু গলায় বেশ ব্যাথা থাকায় আর ডেঙ্গুর ভয়ে আমি কিছুই উপভোগ করতে পারিনি।

মেডিকেলের যে জিনিস টা আমাকে বেশী ভোগাল সেটা হল টয়লেট। ওখানে দেখি কলে পানি নাই কিন্তু বাইরে পানি জমে আছে। খালি চোখেই দেখলাম যে সেখানে এডিস মশার চাষ হচ্ছে।

ব্যাগ হাতে আরেক গ্রুপের দেখা মিলল। একজন বলে আমি পপুলার তো আরেকজন বলে সে কমফোর্ট। একেকজন ডাক্তার আবার একেকজনকে রেফার করে। ব্লাডটেস্ট তো এখানে হচ্ছেই, আবার কী জানতে চাইলে বলে ডেঙ্গু কন্ডিশন শিউর হতে এবং সবকিছু ভালভাবে টেস্ট করতে বাইরে পাঠাতে হবে।

রাতে সকালের আপুদের একজন আটপৌরে পোশাকে এসে আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করল। বুঝলাম সেলফ স্টাডি করতে আসছে, সিরিয়াস স্টুডেন্ট। মা তার নাম জানতে চাইলে বলল সুরভী, থার্ড ইয়ারে পড়ে। এত সুন্দর একটা আপু আমার শার্ট খুলে পড়াশোনা স্টার্ট করলে আমার ভীষন লজ্জা লাগল। আপু আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কেমন লাগতেসে? আমি কি আর বলব!!! বলি, কিছুই লাগতেসে না, কোন অনুভূতি নাই। তখন সে বলল, কয়েকমাস আগে তার নিজের ডেঙ্গু হইছিল এবং তার খুব অসহায় একা একা লাগত। বাকী রাত টা সুরভী আপুকে ভেবে ভেবেই পার হল।

পরদিন সকালে শরীরের র্যা।শ অনেকটাই মিলিয়ে গেল, চোখের লালচে ভাবটা আছে। প্রাক্টিকাল ক্লাস শুরুর আগেই বাসায় ফেরার জন্য বাবাকে তাড়া দিলাম। কিন্তু আমাকে হতাশ করে দিয়ে ডাক্তার বলল, আরো একদিন অভজারভেশনে থাকতে হবে।

আমি উঠে বসে আলপিন নিয়ে ব্যস্ত হতে না হতেই আমার বেডকে ঘিরে প্রফেসরের ক্লাস শুরু হল। ছাত্র-ছাত্রীদের ভিতর সুরভী আপুকে খুঁজে না পেয়ে ভগ্নমনে ক্লাসে মনযোগ দেই। এই ক্লাসের পর থেকে ডেঙ্গু বিষয়ে থিওরেটিক্যালি আমি বেশ স্ট্রং।

বাকী দিনটা ওয়ার্ডের রোগী এবং ডাক্তারদের অবজারভ করে কাটিয়ে দেই। আমার লাস্ট কাউন্ট আসছে দেড় লাখ। বেশ উন্নতি হইছে। অন্য রোগীদের তুলনায় আমার অবস্থা অনেক ভাল। অনেকের যেখানে পাঁচ সাত ব্যাগ ব্লাড লাগছে সেখানে আমাকে আল্লাহর রহমতে অন্য কারো রক্ত শেয়ার করতে হয়নি, শুধু কয়েক ব্যাগ স্যালাইন দিতে হইছে।

একজন ইন্টার্নী ডাক্তারের পরিশ্রম দেখে শ্রদ্ধায় মাথা অবনমিত হল, সিরিয়াস রোগীদের পিছনে তাকে সেই গত রাত থেকে আজ সকালেও অক্লান্ত ডিউটি দিতে দেখছি। তবে বেশীরভাগ ডাক্তারগণ ডিউটিতে মাত্র এসেই চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছে কিংবা রেস্টরুমে গিয়ে আড্ডা মারছে। রাতে আমাকে চেকাপ করার সময় একজনকে মোবাইলে প্রেমালাপও করতে শুনি।

সুরভী আপু আসল সন্ধ্যার পর, মিস্টি হেসে বলল আমাকে নাকি বেশ সতেজ লাগছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফাকে ফাকে আমার পড়াশুনার কথা জানতে চাইল। যথারীতি লজ্জা পাই। সবে ক্লাস টেনে পড়ি আর উনি কত আগায়া গেসেন।

দুইদিন তিনরাত পর অবশেষে তৃতীয়দিন সকালে ছাড়া পেলাম। প্রফেসর আন্টি আমার চোখ দেখে বললেন, ভাল হয়ে গেস। আমাদের ব্যাগ গোছানো দেখে সুরভী আপু এসে একটু মুখ কালো করে মাকে জিজ্ঞেস করে, আজকে চলে যাচ্ছেন? আপুর জন্য আমারো খারাপ লাগে, তবে মনে হয় টার্ম প্রজেক্ট রিপোর্ট সে ভালোমতই সাবমিট করতে পারছে।


সাত বছর আগের ঘটনা, তাই লিখতে বেশ বেগ পেতে হল। তবু স্মরনীয় ঘটনা বলে লিখেই ফেললাম।