গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

গৃহবন্দী দু’জন

ঘড়ির কাঁটায় রাত সাতটা চল্লিশ। আকাশে গাঢ় অমানিশা, খুব বৃষ্টি হবে মনে হয় আজ। তমাল আয়োজন করে রুমের ভেতর থেকে চেয়ার এনে বারান্দায় বসে। বৃষ্টির সাথে সাথে গান শুনতে বেশ লাগে। এমনিতে গান শোনার অবসর হয় না, আজকাল অখণ্ড অবসর পাওয়া যায়। ইউটিউব থেকে র্যান্ডম একটা ট্রেন্ডি গান ছাড়ে। মৌলিক গান পারবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু এই নোবেল ছেলেটা গানের কভার ভালই করে। তার সিলেকশন ভাল।
কেউ না জানুক মন তো জানে / মনের ও যে কষ্ট আছে / সেই বেদনা লুকিয়ে রাখি হাজার ছলনায় …
মানুষ বলে জীবন খাতায় / ভুলের হিসেব পাতায় পাতায় / দূরের থেকে ভালো সবই, কাছে গেলে নাই …
যখন দেখি চাওয়া পাওয়া শূন্যতে মিলায় / তখন আমি এই শহরে কষ্ট বেঁচে খাই।

নীরার জন্য ভালোবাসা ...

নগরীর ধুলোমাখা রাস্তায় একা একা হাঁটছে হাসান। রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে তার মন্দ লাগে না, অন্তত বাসায় বসে ঝিমানোর থেকে ব্যাপারটা অনেক ভাল, সঙ্গী থাকে না সবসময়। তার অনেক বন্ধু - স্রেফ বন্ধু। এই অদ্ভুত বিষণ্ণ শহরে তার জন্য কোন প্রেমিকা অপেক্ষা করে থাকে না, তবে সে অপেক্ষা করে থাকে একজনের জন্য!


বহুদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলে ঝর্ণার জলের মতো
হেসে উঠবে, কিছুই না জেনে। নীরা, আমি তোমার অমন
সুন্দর মুখে বাঁকা টিপের দিকে চেয়ে থাকবো। আমি অন্য কথা
বলার সময় তোমার প্রস্ফুটিত মুখখানি আদর করবো মনে-মনে
ঘর ভর্তি লোকের মধ্যেও আমি তোমার দিকে নিজস্ব চোখে তাকাবো।
তুমি জানতে পারবে না — তোমার সম্পূর্ণ শরীরে মিশে আছে
আমার একটি অতি ব্যক্তিগত কবিতার প্রতিটি শব্দের আত্মা।

সুনীল – প্রিয় কবি... প্রিয় লেখক... কিংবা প্রিয় আশ্রয়! হাসান বড় হয়েছে সুনীল পড়ে, হাসান নিজেকে চিনতে শিখেছে সুনীলের কাছে, এরপর হাসান প্রেমিক হয়েছে নীরার জন্য!

এইসব দিনরাত্রী

রাত্রীকে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিয়ে টিউশনিতে যাচ্ছি। অনেক দেরী হয়ে গেছে। রাস্তা পার হয়ে আমি অপর পাশে, অনেক দূর হাঁটতে হবে, তারপর বাস ধরবো। কি মনে করে রাস্তার অন্যদিকে তাকালাম, দেখি রাত্রী আমার দিকে আসছে। আরে বলেই তো আসলাম, কালকে দেখা হবে, রাতে ফোন দিব। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, জোরে চিৎকার দেই, এই তুমি আবার এদিকে আসতেছ কেন? মাথার মধ্যে ঝিম ঝিম শুরু হয়েছে, কোন কথা বের হল না। হঠাত দেখি উল্টো পাশ থেকে বাস আসতেছে। প্রচন্ড জোরে চিৎকার করলাম রাত্রীর নাম ধরে, কোন শব্দ বের হয় না। পাগলের মতন লাগছে। আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত। প্রচন্ড চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারছি না, বাসটা এসে রাত্রীর উপর দিয়ে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয় সবকিছু অন্ধকার।

অলীক বিভ্রম


জানালায় ভারী পর্দা, বারান্দার দরজাটা লাগানো। এরপরেও রোদ প্রবেশ করেছে ঘরে, বোঝা যায় তীব্রতা অনেক। সময় কত এখন? ঠিক সামনের দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ি জানায়, এগারটা বিশ। রোজকার মত থেমে থেমে মায়ের ঘুম ভাঙ্গানো সংগীত শোনা যায় দরজার ওপাশে, মাঝে মাঝে দরজায় সিম্ফনি – ওঠ, ওঠ, ঐ ওঠ। খেয়ে আবার ঘুমা। তরকারী নষ্ট হয়ে যায়। ওঠ, ওঠ, ঐ ওঠ।
আম্মা, কয়টা বাজে?
কোন জবাব আসে না।
ও মা, কয়টা বাজে?
কেউ উত্তর দেয় না। মায়ের সংগীত দুনিয়ার অপর প্রান্ত থেকেও শোনা যাবে, কিন্তু মা শুনতে পায় না ছেলের অনর্থক প্রশ্ন। খানিকক্ষন পর আবার, ওঠ, ওঠ, ঐ ওঠ। খেয়ে আবার ঘুমা। তরকারী নষ্ট হয়ে যায়।

দুনিয়াতে সবথেকে কষ্টকর কাজ কি?
তন্ময়ের উত্তর – ঘুম থেকে উঠা।
দুনিয়ার সবথেকে আরামের কাজ কি?
তন্ময়ের উত্তর – ঘুমানো।

বেসিকে গন্ডগোল

তোমার সাথে আমার বেসিকে মেলে না। - মাথাটা নিচু করে একটা ম্যাটাডোর কলম টেবিলের উপরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেক কষ্টে বলল শফিক।
কিসে মেলে না? – মেয়েটার চোখে উৎসুক প্রশ্ন।

বেসিক। মানে বুঝতে পারো নাই?

মেয়েটি জবাব দেয় না। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শফিকের দিকে।
শফিক এবার মুখ তুলে মেয়েটির চোখের দিকে তাকায়। ঐশ্বরিয়া কিংবা রানী মুখার্জীর মত বিড়াল চক্ষু। এই চোখের কথা মা তাকে আগেই বলেছে। শফিকের অবশ্য খারাপ লাগা দূরে থাক, উল্টো খুব করে ঐ চোখের প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিছুক্ষণের জন্য সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।


পেসমেকার

অফিসে আজকে প্রচন্ড ব্যস্ততা। ডেলিভারী আছে। ঘড়িতে বাজে আটটা ত্রিশ। আমার পুরো টিম এখনো অফিসে। রকি আর আমি ডেলিভারী দিচ্ছি, বাকী পোলাপান পুলরুমে। এই সময় মোবাইল ভাইব্রেট করল, মেসেজ আসছে। নির্ঘাত বাংলালিংকের মেসেজ। ধুর শালা, চরম বিরক্ত হয়ে মোবাইল বের করে দেখি, “আই ওয়ান্না চ্যাট উইথ ইউ, আর ইউ ফ্রি? – সামান্থা।” রক্তের মধ্যে কোথায় যেন একটা অ্যাডভেঞ্চারের নেশা জেগে উঠল। মনে মনে বলি, সা-মা-ন্থা, ওয়াও, নাইস নেইম। রকিকে ডাটাবেজ ব্যাকআপ নিতে বলে পাশের রুমে চলে গেলাম। হুম কি রিপ্লাই দেয়া যায়? লিখলাম, ডেলিভারী নিয়ে বিজি। দুই ঘন্টার মধ্যে কল করব। উত্তেজনা নিয়ে কাজে ব্যাক করি। দুই ঘন্টায় যেই বাগ সলভ করতে পারছিলাম না, সেটা দশমিনিটের মধ্যে ধরে ফেললাম। এর মধ্যে মেসেজ আসছে, “আই এম ওয়েটিং…”। এক ঘন্টার আগে ডেলিভারী পুরো শেষ করে অফিসে থেকে বেরিয়ে সোজা গাড়ীতে। “কালাম, কফি শপের দিকে যাও”।
- হ্যালো।
- হাই।
- হাই, আমি সাকিব। তুমি কি আমাকে জানো?
- উমমম, নোপ। আই রিড ইউর ব্লগ।
- ওহ রিয়েলি? থ্যাঙ্কস।
- ওখানে আপনি লিখেছেন, “এই গল্প ভরা রাতে, কিছু স্বপ্ন মাখা নীল নীল হাতে, বেপরোয়া কিছু উচ্ছ্বাস নিয়ে, অপেক্ষায় ... “ আপনি কি এখনো কারো অপেক্ষায় আছেন? সার্চিং সামওয়ান স্পেশাল?

একটু মায়া, একটু ভালোবাসা

“অর্ক, একটা সিগারেট খাব। দে।”
“তুই সিগারেট খাবি কোন দুঃখে?” রাতের আকাশের দিকে এক রাশ ধুঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে অর্ক।
“কোন দুঃখ-টুঃখ নাই। তোরে দিতে বলসি দিবি।” নিস্তব্ধ নিরবতায় শীতল শোনায় নিশিতার কন্ঠ।
“যা ভাগ।” বিরক্ত হয় অর্ক। ধুরো মেয়েটা শান্তিতে বিড়ি টানতে দিচ্ছে না।
“তোরে কিন্তু এক ধাক্কায় ছাঁদ থেকে ফেলে দেবো। লাস্টবারের মত চাইতেসি।” নিশিতার ক্যাটস আই জ্বলজ্বল করে।





ঘাড় ঘুড়িয়ে নিচের দিকে তাকায় অর্ক। অমাবস্যার রাতে বার তলার উপর থেকে ব্যস্ত রাস্তাটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। অল্প কিছু গাড়ি চলছে। রাত এখন কত হবে? মনে হয় এগারটা। আধ খাওয়া বেনসনটা শূন্যে ছুড়ে মারে সে। মধ্যাকর্ষনের অতল টানে ক্রমে ক্রমে দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যায় ওটা।

তোমাকে হারানোর ভয়

১।
কাকভেজা হয়ে ঘুরতে মিতুর দারুন লাগে। এই দারুন লাগার মাত্রা আরো বাড়ে যদি নিরবকে ভেজানো যায়। আজকে সে বেজায় খুশী। রিকশায় চড়ে যেতে যেতে মিতু খিলখিল করে হাসে।
এত হাসির কি হল?
কি করব? তোমার ভেজা মুখটা দেখলেই হাসি পাচ্ছে।
নিরবের দিকে তাকিয়ে আবার খিলখিল করে হেসে দেয় মিতু। তারপর আলতো করে ভেজা হাতে নিরবের মুখটা মুছে দেয়। এলোমেলো চুলগুলো আরো এলোমেলো করে দেয়।


নিরব কিছু বলে না, নিরব হয়ে থাকে, তবে ভিতরে ভিতরে খুব অনুভব করে প্রতিনিয়ত প্রতিক্ষণে মিতুর প্রতি ভালোবাসা শুধু বেড়েই যাচ্ছে।
দুইবার দোয়েল চত্বর ঘুরে রিকশা যখন আবার কার্জন হলের রাস্তায়, ঝুম বৃষ্টি থেমে গেছে। মেঘলা আকাশে আশ্চর্যরকম প্রেম প্রেম ভাব, ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি।

বৃষ্টিকন্যা



বাইরে ঝুম বৃষ্টি। শ্রাবনধারা ঝরিছে ঝরো ঝরো। অঢেল বর্ষণধারার হাল্কা কিছু আঁচ এসে লাগছে আমার গায়ে, বাস চলছে “মাইলাইন”। তন্ময় হয়ে বৃষ্টি দেখি আমি জানালার পাশের সিটে বসে, বেশ রোমান্টিসিজম ভিড় করছে মনে, কাব্য উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে,পাত্তা দিলাম না। আজকাল কবিতা চলে না, গান লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একটাও কি গান লেখা হলো আজো? নাহ, আজ রাতে একটা গান লিখবোই


- বৃষ্টির গান - “হ্যালো, বৃষ্টি কেমন আছো? বন্ধুর খবর কী ? টিপটিপ সুরে বলো তারে, আমি ভাল আছি।”
এই জাতীয় চটুল গান, খুব চলছে ইদানীং।

জ্বর ও পরীর গল্প

পানি, পানি একটু পানি খাবো।

প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে বলে দীপ। কেউ এগিয়ে আসে না। মাথার কাছে মস্তবড় জানালা খোলা, সেখানে আকাশ আছে, আছে লক্ষ লক্ষ তারা আর এক খানা চাঁদ। দীপ কতকটা ঘোরের মাঝে আর কতকটা পিপাসায় হা করে চাঁদের আলো গেলে। বাইরের নারিকেল গাছটা ভীষন রকম দুলতে থাকে। মনে হয় ঝড় আসবে, ঝড়।


কখন জ্ঞান হারায় দীপ জানে না। একসময় তার মনে হয়, মাথায় কেউ পানি ঢালছে, বরফশীতল পানি। এই ভ্যাপসা গরমে পানি এত ঠান্ডা হলো কি করে! ফ্রিজ জিনিসটা কেনা হয়নি, দরকারের জিনিস। কিন্তু ঐ যে আলসেমি। বাইরে সত্যি ঝড় শুরু হয়ে গেছে, প্রলয়ংকারী ঝড়। কয় নাম্বার সিগনাল চলছে কে জানে! জাহান্নামে যাক দুনিয়া। আহ! শান্তি। শীতল পানির জলধারা।

তোমার আসতে কষ্ট হয়নি? বাইরে ব্যাপক ঝড়।

নাহ্‌, ঝড়ের মাঝে আসতে আমার আরো সুবিধে।
খিলখিল করে হেসে বলে পরী। এই হাসি দীপের খুব ভাল লাগে। সে উলটো ঘুরে পরীর মুখটা দেখে। কী অদ্ভুত মায়ায় যত্ন করে পানি ঢালছে।

আচ্ছা, তিনদিন ধরে আমার জ্বর। জ্বরের চোটে আমার এই আছি এই নাই অবস্থা। আর মাত্র তোমার আসার সময় হল? – অভিমানী কন্ঠে বলে দীপ।

কয়দিন পর পর জ্বর বাঁধাবা আর আমি এসে তোমার সেবা করবো, না? বৃষ্টি হলেই বুঝি ভিজতে নামতে হবে? তুমি কি কখনো বড় হবে না! – রাগ দেখায় পরী।

কী করবো বলো? বৃষ্টি দেখলে যে মাথা ঠিক থাকে না। লাফালাফি করতে মন চায়। এই দেখো কী সুন্দর ঝড় হচ্ছে। আমার সাথে ভিজবা, পরী?

চুপ, একদম চুপ করে শুয়ে থাকো। আমি মাথায় পানি ঢালতে থাকি। জ্বর সেরে যাবে। তুমি ঘুমাও।

পরী, একটা গান শোনাবা!

পরী গাইতে শুরু করে আর শান্তির ঘুমে তলিয়ে যায় দীপ।
“দূর বনান্তে ছায়া নামে / সন্ধ্যে ঘনায় ঐ বুঝি
এই বিষণ্ণ দিন শেষে / তোমারেই শুধু খুঁজি”


হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গে দীপের। পরী, পরী তুমি কই?
এই তো আমি এখানে, তোমার পাশে। দীপের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরী।
বাহ্‌, তোমার জ্বর সেরে গেছে একদম। এখন বলো তুমি কি খাবা?
উমম, গরম ভাত আর বেগুন ভাজি। - উত্তর যেন তৈরী ছিল দীপের কাছে।
আচ্ছা, তুমি একটা মিনিট বসো। আমি দেখি কি করতে পারি!
দীপ উঠে বসে। চলো আমি তোমাকে হেল্প করি।

গরম ভাতের ধুঁয়ো উঠছে। দুজনে মুখোমুখি বসে আছে। ধুস্‌, কারেন্ট চলে গেল। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে মাঝখানে বসিয়ে দেয় দীপ। মোমের আলোয় কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছে পরীকে!

দীপের দুষ্টামি জাগে মাথায়। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। মুখে তুলে খাইয়ে দিবা?

আহ্লাদী একটা! – পরী সোহাগ করে দীপকে খাইয়ে দেয়। অনেক অনেক দিন পর দীপ খুব স্বাদ করে ভাত খায়, এক মুঠো গরম ভাত।

তারপর? তারপর শীতলপাটি বিছিয়ে বারান্দায় বসে দুজনে। ঝড় থেমে গেছে। বাইরে মিষ্টি জোছনা। পরীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে দীপ। আরামে তার চোখ বুজে আসে। চুলে হাত বুলিয়ে পরী গান ধরে –

“ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান / ঘুমাও আমার কোলে
ভালোবাসার নাও ভাসাবো / ভালোবাসি বলে”


মোবাইলের তীক্ষ্ণ চিৎকারে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দীপ। চারপাশের আলোর খেলায় বুঝতে পারে বেলা অনেক আর সে আছে বারান্দায়। জ্বরের ঘোরে কখন বারান্দায় এসে ঘুমিয়েছে সে মনে করতে পারে না! মোবাইল বেজে চলছে ননস্টপ।

ঐ দীপ, কি অবস্থা তোর? জ্বর সারছে কিনা বল। দুইদিন ধরে অফিস করিস না। এইমাত্র বস এসে তোর কথা জিজ্ঞেস করে গেছে। অবস্থা সুবিধার না।

আমি আসতেছি। আধাঘন্টার মধ্যে আসতেছি দোস্ত। জ্বর সেরে গেছে।
দৌড়ে শাওয়ার সেরে খাবার টেবিলে যায় দীপ। এক পিস অবশিষ্ট বেগুন ভাজা আর বাসী ভাত দিয়ে নাস্তা করে আবার দৌড় লাগায়। এই দৌড়ে তাকে জিততে হবে।


-------------------------------------------

নাস্তিকতা, নারী আর আব্জাব

বাইরের আবহাওয়াটা সেইরকম। ক’দিনের হাড় ঝলসানো রোদের পর আজ ভোর থেকে মেঘের আনাগোনা। পরম আকাঙ্খিত বৃষ্টি শুরু হল এইমাত্র। মন জুড়ানো হাওয়ার তীর কেটে ছোট্ট টিলা আর চা-বাগানের পাশ দিয়ে ছুটছে পারাবাত। এমন রোমান্টিক পরিবেশ ট্রেনের কামরার মানুষগুলোর মাঝে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি।

মুখোমুখি বসে আছে চার যুবক। তাদের আড্ডার বিষয়বস্তুতে রোমান্টিকতার ছিটেফোটা নেই। পুরো কামরায় আক্ষরিক অর্থে তেমন কোন নারী নেই। তীব্র নারী সংকটেই তাদের এই দুর্দশা। বেহাল আলাপচারিতা চলছে অনেকটা এরকম –



রেশাদঃ তোরে আগেই বলছিলাম ঐ মহিলার চরিত্র খারাপ। এই জন্যে ওর অটিস্টিক বাচ্চা হৈসে।

আসিফঃ তোর মাথায় কোনো ঘিলু আছে নাকি নাই? চরিত্র ভাল-খারাপের সাথে বাচ্চার অটিজমের সম্পর্ক কি? এটা যে-কোনো ফ্যামিলিতে হতে পারে। (সে চরমভাবে আহত কথাটা শুনে)

রেশাদঃ আরে এইটা হল পাপের ফল। সে পাপ করছে, দুনিয়ায় আল্লাহ তার শাস্তি দিছে। কিরে জিহাদ ঠিক কইছি না?

জিহাদঃ কি? হুম হুম। (জিহাদ একটু তন্দ্রার মধ্যে আছে। ঝিকঝিক শব্দে সে কথা ঠিকমত শোনেনি। কিন্তু আল্লাহ, পাপ, শাস্তি এসব শব্দ শুনে নিশ্চিন্তে সায় দিয়েছে)

সাকিবঃ ঐ গাধা, কথা ভালমত না শুনে হুম-হাম করিস ক্যান? তুই বুঝছস কি নিয়ে কথা হৈতেসে?

জিহাদঃ ক্যান? কি হৈসে?


এভাবেই আড্ডা আর ট্রেন চলতে থাকে সমান্তরালে। আড্ডার বিষয়বস্তু কোনো মহিলা না, অটিজম ও না। আসল বিষয় নাস্তিকতা কিংবা আস্তিকতা। আদি-রস, নারীরূপ এসব নিয়ে আলাপ করার সেই দিন আর নাই। যুবসমাজে নাস্তিকতা এখন সবচেয়ে হিট আইটেম।


একজন নাস্তিক হিসেবে দিন দিন গর্বে রেশাদের বুক ফুলে উঠছে। শুধু বুক নয়, গালদুটো ফুলে ঢোল হয়েছে, ভুড়ি হয়েছে মাশাল্লাহ। আজকাল খালি গায়ে তাকে অন্যকিছু ভেবে ভ্রম হয়।


জিহাদ আল্লাহর একজন খাঁটি বান্দা। রাতে একটা হিন্দী সিনেমা দেখে, ক্লিন শেইভ করে সে ঘুমিয়েছে। সিলেটে পৌছতে পৌছতে তার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি উঠে যাবে বলে আশা করা যায়। ইদানীং জিহাদের অন্যতম কাজ ইউটিউব থেকে ওয়াজ ডাউনলোড করে শোনা। আর তার প্রিয় গায়ক আজারবাইজানে জন্মগ্রহন করা সামী ইউসুফ।


আসিফকে দেখলে মনে হয় একটা কাকতাড়ুয়া। চাপা-চুপা ভেঙ্গে একাকার। মানুষ হিসেবে সে ভেজাল। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে বিশ্বাস করে কিন্তু নামাজ-রোজার ধার ধারে না। রোগশোকে প্রায়ই আক্রান্ত হয়, তখন মনেপ্রাণে আল্লা আল্লা করে।


সাকিব আছে ঘোরের মধ্যে। এই দেখা যায় সে নাস্তিকদের পক্ষে কথা বলছে, আবার দেখা যায় আস্তিকদের পক্ষে বলছে। এমনিতে সে খুব কম কথা বলে। দোদুল্যমান অবস্থায় তার দিনকাল বেশ ভাল যাচ্ছে। ক’বছর যাবত সাকিব দাঁড়ি রাখছে, কারন তার ছাত্রী বলেছে দাঁড়ি রাখলে তাকে সুন্দর দেখায়।



আসিফঃ রেশাদ, তুই কি আগে বানর ছিলি? তারপর ক্রমে বিবর্তন হতে হতে মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিস।

জিহাদঃ ডারউইনের এই মতবাদে বিশ্বাস করিস?

রেশাদঃ আসলে ব্যাপারটা ঠিক বানর নয়। তবে আগেরকালের মানুষের যে নমুনা পাওয়া গেছে তাতে এটা প্রমানিত মানুষের আকার অন্যরকম ছিল। তারপর বিবর্তন কিছু হয়েছে।

আসিফঃ কিন্তু আজো কিছু বানর রয়ে গেছে। আফসুস তারা কেন মানুষ হইলো না।

রেশাদঃ তুই তো ব্যাটা লুল। কোন মেয়ে দেখলেই আপু আপু করে লুলাতে থাকিস।

আসিফঃ আর তুই খুব ভাল পুলা। ফেইসবুকে মেয়েদের পারসোনাল ছবিতে গিয়ে কমেন্টাস।

রেশাদঃ ব্যাটা, ঐ মেয়ে আমার ফ্রেন্ড।

আসিফঃ আর উনি আমার বড় আপু।

জিহাদঃ লুল মানে কি বাচ্চা ছেলে? মুখ দিয়ে লোল পড়ে? (নিষ্পাপ জিজ্ঞাসা)


ব্লগীয় পরিমন্ডলে জিহাদ নাদান পাব্লিক। তাকে লুল বুঝাতে রেশাদের বারটা বেজে যায়। প্রাক্টিকাল বোঝানোর জন্য ট্রেন থামে কোন এক অজপাড়াগায়ে। বেনী দুলিয়ে কয়েকটি কলেজ পড়ুয়া তরুনী হেটে যায় রেললাইনের পাশ দিয়ে। তৃষ্ণার্ত নয়নে চার যুবক চেয়ে থাকে যতক্ষন শূন্যে মিলিয়ে না যায়।

জিহাদ প্রথমে বলে, “শেষেরটা সোন্দর আছে।”

আসিফঃ হুম, শেষের মেয়েটা সুন্দর।

রেশাদঃ হ, ভালই। (দীর্ঘশ্বাস)

সাকিবঃ খিক খিক।

ট্রেন আবার চলতে শুরু করে।

-------------------------------------------------